কোরআন ও প্রযুক্তি থেকে মুসলমান বিচ্ছিন্ন কেন?
‘ইয়া-সিন। বিজ্ঞানময় কোরানের শপথ, নিশ্চয়ই! আপনি আল্লাহর প্রেরিত মহাপুরুষদের (রাসূলদের) অন্তর্ভুক্ত এবং ‘সিরাতুল মুস্তাকিম’ তথা সরল-সঠিক পথে প্রতিষ্ঠিত।’ (সূরা ইয়া-সিন, ৩৬:১-৪।) আলোচ্য চার আয়াতের শানে নুজুল সম্পর্কে বলা হয়েছে, সে সময় মক্কার কুরাইশ বংশীয় কাফেররা অত্যন্ত জোরেশোরে রাসূলের (সা.) নবুওয়াত ও রিসালাতকে অস্বীকার করছিল। তাই আল্লাহতায়ালা ‘বিজ্ঞানময়’ কোরআনের শপথ করে ঘোষণা করলেন, ‘নিশ্চয়ই! আপনি রাসূলদের অন্তর্ভুক্ত এবং সঠিক পথে প্রতিষ্ঠিত।’ (তাফহিমুল কোরআন, ১৩ খণ্ড, ৩ পৃষ্ঠা।)
মক্কার কাফের কর্তৃক মুহাম্মাদের (সা.) রিসালাত অস্বীকারের জবাবে আল্লাহতায়ালা কোরআনের সঙ্গে ‘বিজ্ঞানময়’ বিশেষণ জুড়ে দেয়ার রহস্য দীর্ঘদিন আমার কাছে অস্পষ্ট ছিল। প্রয়াত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের আÍজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘আমি’ পাঠ করে ‘বিজ্ঞানময়’ শব্দ ব্যবহারের রহস্য বোধগম্য হয়েছি। হুমায়ূন আহমেদ লিখেছেন, ‘একদিন বিজ্ঞানই প্রমাণ করবে এ মহাবিশ্বের একজন স্রষ্টা আছেন। স্রষ্টার অস্তিত্ব প্রমাণ করা বিজ্ঞানের কাজ, দশর্নের কাজ নয়।’ তেমনি বিজ্ঞানই একদিন প্রমাণ করবে মুহাম্মাদের (সা.) রিসালাত ও হেদায়াত সত্য এবং নির্ভুল ছিল।
গত কয়েকশ’ বছর ধরে নবী প্রেমিক উম্মতরা ধর্মের খুটিনাটি বিষয় নিয়ে প্রথমে গবেষণা অতঃপর বিবাদে-বিতর্কে লিপ্ত থাকার কারণে ‘বিজ্ঞান রাজ্য’ থেকে ছিটকে পড়েছে অনেক দূরে। উম্মতের মানসিকতা এতই বিজ্ঞানবিরোধী হয়ে পড়েছে যে, বিজ্ঞানময় কোরআনের বড় বড় মুফাসসির হওয়া সত্ত্বেও বিজ্ঞান নিয়ে চিন্তা-গবেষণা দূরের কথা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিরুদ্ধে ফতোয়া দিতেও পিছপা হচ্ছেন না। বরং ফতোয়াবাজিকেই কোরআনের খেদমত ও জিহাদ মনে করে প্রশান্তি অনুভব করেছেন।
মাইক, রেডিও, টেপরেকর্ডার, টিভি, ফ্রিজ, মোবাইল, কম্পিউটারসহ বিজ্ঞান যখনই মানবতার কল্যাণে একধাপ এগিয়েছে, তখনই আমাদের দেশের এক শ্রেণীর আলেম ‘কাফেরদের তৈরি জিনিস বলে’ ফতোয়াবাজি করেছেন। বড় আশ্চর্য হই যখন শুনি এক সময় ফতোয়াবাজি চলেছে ‘ইংরেজি’ ভাষার বিরুদ্ধেও। ‘ইংরেজি কাফেরদের ভাষা। তাই কেউ এ ভাষা শিখতে পারবে না, শেখাতেও পারবে না। এ ভাষায় কথা বলে এমন কারও সঙ্গেও মেলামেশা হারাম।’ অথচ ভাষার স্বকীয়তা, মহত্ত ও তাৎপর্যের স্বীকৃতি দিয়ে আল্লাহ বলেন, ‘আমি নিজের বাণী পৌঁছানোর জন্য যখনই কোনো রাসূল পাঠিয়েছি, সে তার নিজের সম্প্রদায়ের ভাষায় বাণী পৌঁছিয়েছে, যাতে সে তাদেরকে খুব ভালো করে পরিষ্কারভাবে বুঝাতে পারে।’ (সূরা ইবরাহিম, ১৪:৪।)
‘বিজ্ঞানময় কোরআনের অনুসারীদের বিজ্ঞানবিমুখতার এ চিত্র সত্যিই ভাবিয়ে তুলছে। এক মসয় এ দেশে কোরআনের বাংলা অনুবাদ পড়ার বিরুদ্ধে ফতোয়া ছিল। আজ বাংলা কোরআন মানুষ পকেটে নিয়ে ঘুরছে। নিজের এন্ড্রোয়েড ফোন-ল্যাপটপ অথবা পকেট থেকে কোরআন খুলে যাত্রা পথে কিংবা কাজের অবসরে পড়তে দেখা যায় অনেককেই। মাদরাসাগুলোতে নিজস্ব উদ্যেগে খোলা হয়েছে ‘উচ্চতর কোরআন গবেষণা অনুষদ’। এত কিছুর পরও বিশ্ব মুসলমান ক্রমাগত পিছিয়েই যাচ্ছে কেন?
গত একশ’ বছর ধরে আমরা কোরআনের মুফাসসির পেয়েছি অনেক; কিন্তু কোরআনের বিজ্ঞানী পাইনি একজনও। বিজ্ঞানময় কোরআনের অনুসারীরা বিজ্ঞানভিত্তিক চিন্তা-গবেষণা থেকে যখই নিজেদের গুটিয়ে নিয়ে ধর্মীয় কোন্দলে জড়িয়ে পড়েছেন তখনই আল্লাহতায়ালা তাদের থেকে বিশ্ব নেতৃত্ব ছিনিয়ে নিয়েছেন। প্রজ্ঞাবানরা বলেন, আজকের মুসলমানরা কোরআনকে জিন-ভূত তাড়ানো আর তাবিজের বই হিসেবে ব্যবহার করছে। তাই কোরআনও তাদের জিন-ভূত তাড়ানোর ফকির হওয়া পর্যন্তই সীমাবদ্ধ করে দিয়েছে। তারা কোরআন দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা ও বিশ্বকে নেতৃত্ব দেয়ার স্বপ্ন দেখছেন না এবং এ সম্পর্কে কোরআনকে জিজ্ঞাসাও করছেন না। কোরআন নামক মহাসমুদ্র থেকে তারা কয়েক ফোঁটা পানি চাইছে মাত্র অথচ কোরআন তাদের বড় বড় নদী-সাগর দিতে প্রস্তুত রয়েছে। কোরআনের প্রচার-প্রসার ও চিন্তা-গবেষণার ক্ষেত্রে প্রগতিশীল মুক্ত চিন্তার আলেম এবং মাদ্রাসা শিক্ষা যেভাবে ভূমিকা রাখছে, কোরআনের বিজ্ঞানী তৈরির ক্ষেত্রেও সেভাবে আলেম-ওলামাদের অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে- এমনটিই মনে করছেন আধুনিক মুসলিম বুদ্ধিজীবী-বিজ্ঞানী এবং কোরআন গবেষকরা। একজন কোরআন গবেষকের ভাবনা উপস্থাপন করা হল এ লেখায়- আল ফাতাহ মামুন
ড. সাইয়েদ আবদুল্লাহ আল মারূফ
সহযোগী অধ্যাপক, আরবি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
প্রশ্ন : মাদ্রাসাগুলো থেকে কোরআনের মুফাসসির তৈরি হয়, কোরআনের বিজ্ঞানী তৈরি হয় না কেন?
উত্তর : ভারতীয় উপমহাদেশে মাদ্রাসা শিক্ষকদের বিজ্ঞানচর্চায় অনাগ্রাহ এবং অজ্ঞতার কারণেই গত একশ’-দেড়শ’ বছর মাদ্রাসাগুলো থেকে কোরআনের বিজ্ঞানী তৈরি হয়নি। কোরআন ও বিজ্ঞানচর্চার জন্য স্বতন্ত্র কোরআন গবেষণা অনুষদ বা কোরআন ও বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্র চালু করা জরুরি- এ কথা আলেম সমাজ স্বপ্নেও ভাবেন না।
প্রশ্
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন